হালচালের গল্প
আজ জিসা, মিথুন, রনি, বিথী কেউ এলনা বই মেলায়। গত সাত মাস যাবত লিয়নেরর যোগাযোগ নেই কারো সাথে। গত বছর মে মাসে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে মিথুন ও রনি চলে গেল অস্ট্রেলিয়ায়। বিয়ে হয়েগেছে বিথীর। আর জিসার সাথে পছন্দ অপছন্দ নিয়ে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত লিয়নের।
লিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন ছাত্রনেতা। রাজনীতি লিয়নের খুব প্রিয় বিষয়বস্তু কিন্তু তার গভীর বন্ধুত্ব ছিল মিথুনদের সাথে। মিথুনরা সবাই সাধারণ ছাত্র। তবে লিয়নেরর আচরণটা আর পাঁচজন ছাত্রনেতার মত উগ্র ছিলনা। তাই সাধারণ বন্ধুদের সাথে মানিয়ে নিতে তেমন কষ্ট হয়নি। কিন্তু মাঝেমাঝে জিসার সাথে তার খুনসুটি লেগেই থাকত।
ফুল হাতার শার্ট পড়ে যখন সে হাতা ভাজ করে উপরে উঠিয়ে রাখত তখনই জিসার ছুড়ে দেয়া কটুকথা শুনতেই হত লিয়নকে। আর যেদিন গোল গলার গেঞ্জি পড়ে শার্টের বোতাম গুলো খুলে রাখত সেদিন তো জিসা রাগে কারো সাথে কথাই বলত না। মনে হতো লিয়ন জিসাকে রাগানোর জন্য ইচ্ছে করে এ ড্রেসটা পড়ে এসেছে।
কিন্তু বিষয়টা ছিল অন্য জায়গায়। আসলে লিয়ন ও জিসা উভয়ের বাড়ি স্বপ্নপুর জেলার মধুপুর উপজেলায়। চটপটে জিসা লম্বায় ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। দেখতে শ্যাম বর্ণের জিসার গড়নটা৷ যে কোনকে ছেলেকে আকৃষ্ট করবে। লিয়ন জিসাকে মনে মনে কামনা করত। বিষয়টি যখন জিসা বুঝতে পারে তখনই সে চায়ত লিয়ন যেন তার পছন্দমতো পোশাক পরিধান করে, রাজনীতি যেন ছেড়ে দেয়।
জিসার ধারণা, ভাল মানুষ রাজনীতি করে না। কারণ জিসার বাবা গ্রামের নিম্ন মধ্যভিত্ত এক স্কুল শিক্ষক। কিছু জমিজমাও ছিল তার বাবার। জিসার আর কোন ভাইবোন নেই। তাই গ্রামের রাজনীতিবিধদের চোখ যায় জিসার বাবার জমির দিকে। জিন্নত সাব নামের উপজেলা পর্যায়ের এক লিডারে রক্ত চক্ষুর দাবানলের সামনে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে গ্রামের রাজনীতিবিধদের কাছে অনেক জমি হারাতে হয়েছে জিসার বাবাকে। তখন থেকেই জিসার বাবা আর কোনদিন প্রাণ খুলে হাসেনি। মনের অন্তরালে একবুক কষ্ট চেপে আছে তার বাবার। তাই রাজনীতিবিধদের ভাল মানুষ মনে করার মতো কোন কারণ জিসার জানা নেই।
জিসার জীবনের এমন করুণ কাহিনী জানত না তার কোন বন্ধুবান্ধব। জানত না লিয়নও।
কিন্তু লিয়নের ইচ্ছা, সে তার ছাত্র সংগঠনের সভাপতি হবে। এ জন্য উপজেলা নেতাদের চাটুকারীতা করতেই হবে। মাঝেমাঝে জিসা লিয়নের ফেসবুক স্ট্যাটাস ফলো করে। একদিন দেখল, লিয়ন একটা পোষ্টে লিখেছে, "সৎ, চরিত্রবান, একনিষ্ঠ জনদরদী ও গরীবের বন্ধু, জনাব জিন্নত সাবকে মধুপুর উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চাই।" সাথে জিন্নত সাবের ছবি দেয়া।
এ পোষ্ট দেখে সাথে সাথেই জিসা লিয়নকে কল দিয়ে দেখা করতে বলল। লিয়ন আসতেই জিসা জিজ্ঞেস করল জিন্নত সাব তোমার কী হয়?
উত্তরে লিয়ন বলল 'মামা'। (রাজনৈতিক খাতিরে)
জিসা জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কী সত্যি আমাকে ভালোবাস?'
লিয়ন বলল, 'হ্যাঁ'।
জিসা বলল, 'আমি সিরিয়াস হয়ে তোমাকে একটা কথা বলি, শুন। তুমি যদি জিন্নত সাবকে নিয়ে এধরনের প্রচারণা করো তাহলে কোনদিনও আমাকে পাবে না। আজকে থেকে তোমার আমার সম্পর্ক এখানেই শেষ।' এই বলে জিসা চলে গেল। জিসাকে আটকানোর চেষ্টা করল লিয়ন, কিন্তু সে লিয়নের কথায় কান না দিয়ে চলে গেল।
উত্তরে লিয়ন বলল 'মামা'। (রাজনৈতিক খাতিরে)
জিসা জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কী সত্যি আমাকে ভালোবাস?'
লিয়ন বলল, 'হ্যাঁ'।
জিসা বলল, 'আমি সিরিয়াস হয়ে তোমাকে একটা কথা বলি, শুন। তুমি যদি জিন্নত সাবকে নিয়ে এধরনের প্রচারণা করো তাহলে কোনদিনও আমাকে পাবে না। আজকে থেকে তোমার আমার সম্পর্ক এখানেই শেষ।' এই বলে জিসা চলে গেল। জিসাকে আটকানোর চেষ্টা করল লিয়ন, কিন্তু সে লিয়নের কথায় কান না দিয়ে চলে গেল।
লিয়ন কল দিল জিসাকে। কয়েকবার কল দেওয়ার পর রিসিভ করল জিসা। লিয়ন বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করল, 'সামনে ছাত্র সংগঠনের উপজেলা কমিটি দিবে তাই উনার হ্যাল্প লাগবে আমার। প্লিজ লক্ষিটি রাগ করোনা।'
জিসা বলল, 'তুমি পোষ্টে যেসব গুনের কথা লিখেছে এসবে কোনো কিছুই উনার সাথে যায়না। আর উনি বিনা লাভে তোমার পাশেও থাকবে না। তুমি যদি উনাকে ত্যাগ করতে না পার তাহলে আমার সাথে তোমার যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে হবে।
লিয়ন রাজনীতি নিয়ে কৌটিল্যের দেয়া বিখ্যাত সংজ্ঞাটির কথা ভাবল আর মনে মনে চিন্তা করল রাজনীতির জন্য মানুষ ধর্ম ত্যাগ করে। আর তাছাড়া আমি যদি ছাত্র সংগঠন এর সভাপতি নির্বাচিত হই তাহলে আমার জৌলুশ দেখে জিসা আবার ফিরে আসবে আমার হয়ে।
সময়ের প্রবাহে জিন্নত সাব উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হল। ডাক ঢোল পিটিয়ে সবাই বিজয়ের মালা পড়াল, লিয়নও ছিল সাথে।
কয়েকদিন পর উপজেলা ছাত্র সংগঠন সম্মেলন। লিয়ন সভাপতি প্রার্থী। কিন্তু সম্মেলন শেষে লিয়নের হিসাব মিলল না। সভাপতি হল অন্যকেউ। (এসব সাত মাসে ঘটে যাওয়া কল্পনার কাহিনী)
বই মেলায় বসে লিয়ন নিজের দিকে লক্ষ্য করে দেখল আজ তার শার্টের সব গুলো বোতাম লাগানো আছে। ফুল হাতার শার্টটি কফ পর্যন্ত বোতাম লাগানো। মনে মনে ভাবল এ আমার জিসার পছন্দের পোষাক। কিন্তু জিসাকে কিভাবে পাই! হঠাৎ মাথায় আসল, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১ লা ফাগুন জিসার খুব প্রিয় একটা দিন। এ দিনে বিগত বছর গুলোর মত জিসা খোপায় ফুল দিয়ে বাংলা একাডেমীর পুকুর পাড়ে একবার হলেও আসবে।
১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই লিয়ন অপেক্ষা করছিল সেই পুকুর পাড়ে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায় শেষ, তবুও জিসা এলো না। হঠাৎ দেখতে পেল বিথী তার হাসব্যান্ডকে নিয়ে বসে আছে পুকুর পাড়ের নারিকেল গাছটার নিচে। লিয়ন কাছে যেতেই বিথীর মুখটা বিষন্নতায় ভরে উঠল। জিসার কথা জিজ্ঞেস করতে বিথী কেঁদে উঠল।
বিথী বলল, কিছুদিন আগে জিসার বাবা মারা গেল। তার কিছুদিন পর জিসা স্টুডেন্ট ভিসায় ক্যানাডা চলে গেল। যাওয়ার আগে এই চিঠিটা দিয়ে গেল, যেন তোকে পৌঁছে দেই। এখানে ওর বাবা ও দাদার জীবনের কঠিন পরিনতির কথা লিখা আছে। অনুমতি ছিল যেন আমিও একবার পড়ি। আর আমাকে জিসা বলে গেছে ও তোকে ভীষণ ভালোবাসে। তুই যদি জিসাকে পেতে চাস তাহলে এই নীতিহীন রাজনীতিকে বর্জন করে আসতে হবে।
আজ লিয়ন ঠিকই জিসাকে পেতে চায়। চিঠি পড়ে লিয়ন বুঝল আসলে সব ভাষা সবার সাথে যায় না। এখন নিজেকে অপরাধী ভাবছে লিয়ন।
"জিসা তুমিই ঠিক। আজ থেকে আমি তোমার। আমি আমারও না।"
লেখাঃ শফিকুল ইসলাম (৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯)


No comments