অষ্টগ্রামের বাংগালপাড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্যে আছে সমৃদ্ধির ছাপ।

 



মিসবাহ অনিক: বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা আবেগাপ্লুত হয়ে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ষড়যন্ত্রের সংবাদ সংগ্রহকারী নারী ‘আলেয়া’কে নবাবের গলায় পরিহিত মুক্তার মালা উপহার দিতে গেলে জগৎশেঠ হতচকিত হয়ে বলেছিল, “জাহাঁপনা, এ মালা অনেক মূল্যবান।

স্বাধীনতার পরও আমরাই তো দেখেছি রত্নগর্ভা  বাংগালপাড়ার বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ঝিনুক কুঁড়িয়ে অষ্টগ্রাম পুরাতন সাবরেজিষ্টার অফিসের সামনে বিক্রি করতে। মাত্র ৩০-৪০ বৎসর আগে যদি মুক্তার পসরা বসতে পারে, যদি মুক্তার ছড়াছড়ি থাকতে পারে তবে নবাবের গলার মুক্তার মালাটি যে আমার বাংগালপাড়ার মুক্তার নয়, তা কে বলবে?!

কারণ বাংগালপাড়ার ঝিনুকের মুক্তা সারা ভারতবর্ষে বিখ্যাত ছিল। ইংল্যান্ডেও এই মুক্তার কদর ছিল বলে প্রমাণ আছে। মুলত অনন্ত দত্তের আগমনের পর থেকেই এই অঞ্চলে জনবসতি শুরু হয়েছিল। অবিভক্ত ভারতে বাংগালপাড়া আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঈশা খাঁ'র সঙ্গে কোচ ও হাজং রাজদের ব্যাপক যুদ্ধ, আবার ১৬৩৮ সনে মোগলদের সাথে অহম রাজদের এক তুমুল যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল এখানে। ঐ যুদ্ধে অহম রাজ পরাজিত হয়ে আসাম চলে যায়। এ অঞ্চলে অসমীয় ভাষাভাষীর লোকদের বসবাসের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। বাংলা ভাষাভাষীর বা বাঙ্গালি সংখ্যাঘরিষ্টতার জন্য এ এলাকাটির নাম হয় ‘বাংগালপাড়া’।

খাজা উসমান নামে এক পাঠান সর্দার আকবরের সেনাপতি মানসিংহ কর্তৃক উড়িষ্যা থেকে বিতাড়িত হয়ে সিলেটে প্রবেশ করে, রাজা নগরের রাজা সুবিধ নারায়ণকে পরাজিত করে স্বাধীন রাজা হিসাবে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁ'র নিকট এই সংবাদ পৌঁছালে তিনি উসমান খাঁ-কে আত্মসমর্পণের ফরমান পাঠান। কিন্তু উসমান খাঁ আত্মসমর্পণে রাজি না হলে ইসলাম খানের সেনাপতি সুজাত খাঁ-কে রাজনগর আক্রমণের নির্দেশ দিলে উসমান খাঁ নৌপথে সুবিধা ও নিরাপদ মনে করে বাংগালপাড়া চলে আসেন। সম্ভবত তাঁর (খাজা উসমান) নামানুসারেই উসমানপুর গ্রামের নামকরণ।

সৈয়দ তৈফুরের বর্ণনা মতে, এখানে জমিদার হিসাবে প্রতাপ রায়ের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর নাম অনুসারেই চরপ্রতাপ মৌজার নামকরণ।

পলাশী প্রান্তরে নবাব সিরাজদৌলার অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের ৩০ বৎসর পর, ১৭৮৭ খ্রীষ্টাব্দের ১লা মে, ময়মনসিংহ জেলা স্থাপিত হয়। পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ, পূর্বে সিলেট, উত্তরে গাড়ো পাহাড়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলার বিস্তৃত ছিল।

১৭৯০ এবং ১৮২১ সালে ময়মনসিংহ থেকে আলাদা করে যথাক্রমে ‘ত্রিপুরা’ ও ‘নোয়াখালী’ জেলা গঠন করা হয়। ১৮৩০ সালে ময়মনসিংহ জেলা আবার পুনর্গঠন করা হয়। ১৮৬০ সালে কিশোরগঞ্জ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হলে, বাংগালপাড়া ময়মনসিংহের অন্তর্ভুক্ত হয়।


এখানে উল্লেখ্য: অষ্টগ্রাম ছিল বাজিতপুর থানার আওতাধীন। ১৯০৬ সালে অষ্টগ্রাম প্রথমে 'আউট পোষ্ট' (out post) থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও, ১৯৬২ সালে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক থানা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

 

 অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্যবসা বানিজ্যে বাংগালপাড়ার রয়েছে সোনালি অতীত। আসাম থেকে কলিকাতা পর্যন্ত ইস্টিমার যোগাযোগে এ ঘাটটি ছিল অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ ঘাট। ঝিনুকের মুক্তার পাশাপাশি এখানে গড়ে উঠেছিল ভাটি এলাকার এক বিশাল কাঠের বাজার।

১৩৩৭ বাংলা সাল থেকে ভাটি অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গ্রাম্যমেলা বাংগালপাড়ায় প্রতি বাংলা সনের ৩রা মাঘ অনুষ্ঠিত হয়। যাহা স্থানীয়ভাবে ‘চৌদ্দমাদল’ নামে পরিচিত। হিন্দুধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও এই মেলা উপলক্ষে সব ধর্মের মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসবের আমেজ পরিলক্ষিত হয়।

বাংগালপাড়ার রাধাকান্ত দেবনাথ, নদীয়া চাঁদ রায়, প্রকাশ চন্দ্র সাহা প্রমুখ এই মেলার প্রথম আয়োজক। ব্যবসা বানিজ্যে বাংগালপাড়ার মানুষ অষ্টগ্রাম থানার মধ্যে সবসময়ই এগিয়ে। এখানকার গাইনদের রয়েছে অনেক ঐতিহ্য আর লোকসাহিত্যে বিশেষ অবদান। তারা বাড়ি-বাড়ি ঘুরে চুড়ি বিক্রি করার সময় বিভিন্ন গান গেয়ে বেড়াতো। তাদের ভাঁড় নিয়ে যারা ঘুরে বেড়াতো, তাদের বলা হতো ‘পাইল’। তারা ও বিভিন্ন হাস্যরসের গান গেয়ে মানুষদের আনন্দ দিত।


যুবতীদের উদ্দেশ্য গাইনের গানঃ-

“ওলো ভিনদেশী ছেড়ি, তুমি বড়ই সুন্দরী!
পাগল হইলাম তোমার রুপ দেখিয়া লো...
মাজা চিকন, বাঁকা নয়ন, সোনার নুপুর পায়!
সন্ধ্যাবেলা ঘাঠে আইলা জলের ছলনায়।
জ্বালা কি দিয়া নিভাই ও-ছেড়ি বল কোথায় যাই।...”

 

পাইলদের গানঃ-

“গাইন গেছে উক্কা খাইত, আমি কিছু কই,
হিয়ালে যে বরই খাইল, নুন পাইল কই?
কথার নাই মাথা বেঙে চিড়া খায়,
বাপে বিয়া করার আগে, পুতে হওড় বাড়িত যা।
ছাগল পালে পাগলে, নিত্য ছিড়ে দড়ি।
হাজার টেহার বাগান খাইয়া লেদা বড়ি বড়ি।”


“মইন্যার মা গইন্যা খাইল সাত কাডলের কুশ।...
নানার দাড়িতে কষ লাগলো আমার কি দোষ।”


“ছইত্যার বউ হুইত্যা রইছে খেতা মুড়ি দিয়া,
উইল্যা বিলাই চাইয়া রইছে ভাঙ্গাবেড়া দিয়া।”


“সারা রাইত গীত গাইলাম মড়ল সাবের বাড়িত,
খালি মুখে তুইল্যা দিল ভাঙ্গা গরুর গাড়িত।
ভুল-তিরডি মাফ করবাইন সভার গুনীজন,
বিদ্যাবুদ্দি নাই আমার মুরখ অভাজন।”


-- অসমাপ্ত --


লেখা সংগ্রহঃ জনাব সাইফুল ইসলাম রন্টি।
(চেয়ারম্যান: ২নং কাস্তুল ইউনিয়ন, অষ্টগ্রাম উপজেলা)

No comments

Powered by Blogger.