শোভনের অতীত
"শেষ কথা গুলো আজও মনে পড়ে প্রিয়া। সবসময় চেয়েছি তুমি সুখী হও। কিন্তু সত্যি সত্যি যখন জানলাম তুমি সুখেই আছ, মনের অজান্তেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। জানি না এ পানি কোন বিষন্নতার। নাকি আমার শূন্য হৃদয়ের হাহাকারের!"
ডায়েরিতে কখন এ লিখা শেষ হয়েছে জানা নেই। চেয়ারে বসেই শোভন ফিরে গেল তার অতীতে। মনে হচ্ছে এইত সেদিনের কথা। অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন শোভন। ভর্তি কার্যক্রম শেষে কলা ভবন এর বারান্দায় এক পা ভর দিয়ে দেয়াল হেলান দিয়ে আছে সে। বাহিরে দুয়েক ফোটা বৃষ্টি হচ্ছে। সম্ভবত এপ্রিল মাস ছিল। আনমনা হয়ে বৃষ্টির ফোটার দিকেই চেয়ে আছে সে। হঠাৎ কেউ জিজ্ঞেস করল,
- হাই! আমি দিপা। তুমি? আই মিন, তোমার রোল নম্বর কত?
- আমি শোভন। রোল ১১৪, অনার্স প্রথম বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ।
দিপাঃ হুম জানি। তুমি আমার ঠিক আগে ভর্তির কাজ কমপ্লিট করেছ। আমি দেখেছি আমার রোল ১১৫। তোমার সাথেই আছি। তুমি কি একা? আসলে ক্যান্টিনটা কোন দিকে জানি না তো। আমি আজ প্রথম এখানে। তাই তোমার সাহায্য চাচ্ছি।
শোভনঃ ওহ, শিউর। হ্যাঁ আমি একা। আমিও এখানে প্রথম। তবে ক্যান্টিন আমি চিনি। কারণ সকালে আমি ক্যান্টিনেই নাস্তা করেছি।
সেদিন থেকেই শোভন ও দিপার পথ চলা শুরু। অনেক অনেক মধুর স্মৃতি তাদের। মেসেজিং, কলিং, পিকনিক, জাতীয় দিবসে নৃত্য পরিবেশন.. অকেশনাল ডে গুলো একসাথে উদযাপন। একুশের আলপনায় ক্যাম্পাস সাজানো। বিজয়ে বর্ণীল পোশাক। কোনকিছুতেই অমিল ছিলনা তাদের।
মাঝে মাঝে ঝগড়াঝাঁটি সাধারণ বন্ধুদের মতই চলে। অভিমান করে আবার পরক্ষণেই একসাথে একই দিকে পথ চলা।
জাকির যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তখন চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন হয়েছিল। সবাই মিলে সহযোগীতার ফান্ড গড়েছিল। শোভন ও দিপা ছিল অদম্য, ক্লান্তিহীন পরিশ্রমী। চিকিৎসার সমস্ত টাকায় ফান্ডিং হল। তারা জাকিরের চিকিৎসাও করালো। সুস্থ হল জাকির।
ক্যাম্পাসের সবাই প্রায় চিনে তাদের। এক সাথে প্রাইভেট পড়া, নোট তৈরী করা, হোমওয়ার্ক বিনিময় করা নিত্যদিনের কাজ তাদের।
পিকনিকে একই বাসে যাওয়া, এক সাথে ছবি তুলা, ঘুরে ঘুরে দৃশ্য দেখে বানিয়ে গল্প বলা দুজনেরই অভ্যাস।
এভাবেই কেটে যাচ্ছিল ক্যাম্পাসের দিনগুলো। কিন্তু শোভন একা হলেই কি যেন ভাবে। ভাবে দিপাও।
একদিন শোভন রাতের বেলা এ্যালবামের পুরনো ছবিগুলো দেখছিল একা একা। হঠাৎ চোখ পড়ে দীপার একটি ছবির দিকে। ছবির দৃশ্য কিছুটা এমন, "একটি ছোট নৌকার ওপরে ম্যারন কালারের জামা পরিহিত মেয়েটি। উচ্চতা ৫ ফিট ৩ ইঞ্চির মত হবে। পিছনের ব্যাকগ্রান্ডে সবুজের অভয়ারণ্য যা জলাশয়ের পানিতে এসে মিশে গেছে।"
ছবিটা দেখেই শোভনের ভিতরটা কেঁপে উঠল। শোভনের মনে হচ্ছে সে দিপাকে ভালোবাসে। অনার্স ৪র্থ বর্ষে পড়ে তারা। এখন কী এসব বলা সম্ভব?
এত ভালো ভালো সম্পর্কের মাঝে কিভাবে আমি দিপাকে বলবো আমার ভালোবাসার কথা! এই কথাগুলো ভেবেই নিরব হয়ে যায় শোভন।
এত ভালো ভালো সম্পর্কের মাঝে কিভাবে আমি দিপাকে বলবো আমার ভালোবাসার কথা! এই কথাগুলো ভেবেই নিরব হয়ে যায় শোভন।
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে শোভনের। যদি দিপা রাগ করে। আমাকে যদি ভুল বুঝে! এরকম হাজারটা প্রশ্ন কুঁড়ে কুঁড়ে খায় শোভনকে। কিন্তু সে দিপাকে বুঝতে দেয় না।
হঠাৎ একদিন দিপা নিচু গলায় বলল, "শোভন, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমি আগামিকাল বাড়ি যাচ্ছি। তুই জাকিরকে নিয়ে আসিস।" দিপা চলে গেল।
আজ দিপার বিয়ে। অতিথিতে ভরপুর বাড়ি। শোভন ও জাকির দুজনেই উপস্থিত হয়েছে বিয়েতে।
এক ফাঁকে দিপা এসে শোভনকে জিজ্ঞেস করল, "আমাকে ছাড়া থাকতে পারবি, শোভন?" শোভন দুটি চোখের পানি ছেড়ে দিল। অনেক কিছু বলতে গিয়েও যেন কিছুই বলা হলো না।
শোভনের তন্দ্রা এখনো কাটেনি। ডায়েরির পাতাটা চোখের জলে ভিজে আছে। ততক্ষণে মসজিদ থেকে ফজরের আযান ভেসে আসছে...
লেখাঃ শফিকুল ইসলাম (৭ এপ্রিল, ২০১৯)


No comments